বঙ্গবন্ধু ও ইসলাম

image_173304.mujib0_-300x200

বঙ্গবন্ধু ও ইসলাম

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অতি ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেনতাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন শেখ আউয়ালকিংবদন্তি যে মুঘল আমলে তিনি পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য বাগদাদ থেকে চট্টগ্রাম ও সোনারগাঁয়ে আসেনপরবর্তীকালে তাঁরই উত্তর পুরুষরা অধুনা গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ায় বসতি স্থাপন করেনবঙ্গবন্ধু হচ্ছেন ইসলাম প্রচারক শেখ আউয়ালের সপ্তম অধস্তন বংশধরবঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমানের সুখ্যাতি ছিল সুফি চরিত্রের অধিকারী হিসেবেবঙ্গবন্ধু নিজেও ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণইসলামি আদর্শ, আকিদা, তাহজিব ও তমুদ্দন প্রতিষ্ঠা ও সমুন্নত রাখতে তিনি ছিলেন তৎপর
প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী শিক্ষাবিদ ড. এনামুল হক বলেছিলেন-বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন দুহাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিতিনি গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের মহান স্থপতিস্বাধীনতার অবিসংবাদিত রূপকার ও মহান ঘোষকস্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম ও শ্রেষ্ঠতম কান্ডারিসেই সাথে তিনি ছিলেন পবিত্র ধর্ম ইসলামের একজন শ্রেষ্ঠ সেবকসমকালীন বাংলাদেশে ইসলামি মূল্যবোধ ও আদর্শ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে

১৯৭০ সালের নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বেতার-টেলিভিশনে ভাষণদান প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নইএ কথার জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য  লেবেল সর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নইআমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামেআমাদের ইসলাম হযরত রসুলে করিম (সঃ)-এর ইসলাম, যে ইসলাম জগৎবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্রইসলামের প্রবক্তা সেজে যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধেযে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান সে দেশে ইসলমা বিরোধী আইন পাশের কথা ভাবতে পারেন তারাই, ইসলামকে যারা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা ফারস্থা করে তোলার কাজে

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের সময় ইসলামের বিধানের প্রতি জাতির জনকের অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ এবং ইসলাম ও সুন্নার পরিপন্থী কোনো আইন পাশ না করার অঙ্গীকারের দৃষ্টান্ত হিসেবেই এই স্মরণীয় উক্তির উদ্ধৃতিএটা তাঁর ইসলাম প্রীতিরই একটি অনন্য নজির হয়ে থাকবে
স্বাধীনতার অনেক আগেই বঙ্গবন্ধু বিদগ্ধ আলেমদের সমন্বয়ে গঠন করেছিলেন আওয়ামী উলেমা পার্টিউদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণে ইসলাম সম্পর্কে যাতে উলেমায়ে কেরামদের সুচিন্তিত অভিমত ও সুপারিশ পাওয়া যায়

বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে অনেকেই অপব্যাখ্যা করে থাকেন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার উৎস ছিল ইসলামরে মহান নবি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ঐতিহাসিক মদিনা সনদপ্রয়াত কবি গোলাম মোস্তফা রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ বিশ্বনবীথেকে উক্ত সনদ-এর অংশ উদ্ধৃত করছিঃ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

রসুল মুহাম্মদ বিশ্বাসীদিগকে এবং যারাই তাঁর সাথে যোগ দিবে সকলকেই এই সনদ দিচ্ছেনমদিনার ইহুদি নাসারা পৌত্তলিক এবং মুসলমান সকলেই নিজ ধর্ম পালন করবে, কেউই বিনা অনুমতিতে কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে নাকেউই হযরত মুহাম্মদের বিনা অনুমতিতে কারও সাথে যুদ্ধ করতে পারবে নানিজেদের মধ্যে কোনো বিরোধ উপস্থিত হলে আল্লাহ ও রসুলের মীমাংসার উপর সকলকে নির্ভর করতে হবেবাইরে কোনো শত্রুর সাথে কোনো সম্প্রদায় গুপ্ত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে না মদিনা নগরীকে পবিত্র মনে করবে এবং যাতে তা কোনোরূপ বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত না-হয়, সে দিকে লক্ষ রাখবেযদি কোনো শত্রু কখনও মদিনা আক্রমণ করে, তবে তিন সম্প্রদায় সমবেতভাবে তাকে বাধা দেবেযুদ্ধকালে প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজেদের ব্যয়ভার নিজেরা বহন করবেনিজেদের মধ্যে কেউ বিদ্রোহী হলে অথবা শত্রুর সাথে কোনোরূপ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে তার সমুচিত শাস্তি বিধান করা হবেÑ সে যদি আপন পুত্র হয়, তবু তাকে ক্ষমা করা হবে নাএই সনদ যে ভঙ্গ করবে সে বা তাদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের বিশা থেকে মুক্ত হয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে পদার্পণ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল সমাবেশে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেনÑ “বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইসলামের অবমাননা আমি চাই নাআমি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে দিতে চাই: আমাদের দেশ হবে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক দেশএ দেশের কৃষক শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সবাই সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে

এখানেই শেষ নয়তার কিছু দিন পর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গণপরিষদে এক ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন: বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবেহিন্দু তার ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টান তার ধর্ম পালন করবেবৌদ্ধও তার ধর্ম পালন করবেএ মাটিতে ধর্মহীনতা নাই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছেএর একটা মানে আছেএখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে নাধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে নাধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আলবদর পয়দা করা বাংলার বুকে আর চলবে নাঅত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এখন আবার ধর্মের বেসাতি ও ধর্মের নামে রাজনীতি চলছেচলছে রাজাকার-আলবদরের দৌরাত্ম্যজেনারেল জিয়াই হচ্ছেন এর জন্যে দায়ীতিনি সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দেন এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ রদ করেন

গণপরিষদে দেশের খসড়া সংবিধানের উপর ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম পালনে জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানে তার সরকারের দৃঢ় সংকল্পের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে ৪ অক্টোবর ১৯৭২ আবারো ঘোষণা করেনঃ ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের সবার ধর্ম-কর্ম করার অধিকার থাকবেআমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করব নামুসলমানেরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারও নেইহিন্দু তার ধর্ম পালন করবে, কারও বাধা দেয়ার ক্ষমতা নেইখ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কেউ বাধা দিতে পারবে নাআমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না২৫ বছর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানি, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যভিচারÑ এই বাংলাদেশের মাটিতে এসব চলছেধর্ম অতি পবিত্র জিনিসপবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে নাযদি কেউ বলে যে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলবো ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নিসাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি

এর ৮ দিন পর ১২ অক্টোবর, ১৯৭২ গণপরিষদে আবারও ভাষণদানকালে বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যাদান প্রসঙ্গে সেই একই ভাষায় তাঁর সরকারের সদিচ্ছার কথা ঘোষণা করে বলেন: ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবেহিন্দু তার ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ যে যার ধর্ম পালন করবে কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে নাযদি কেউ ব্যবহার করে তবে বাংলার মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করবে, এ বিশ্বাস আমি করি
সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, বঙ্গবন্ধু ইলমামের চেতনা ও মূল্যবোধ এবং ইসলামের নবির (দঃ) আদর্শে একটি সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনে ব্রতী হয়েছিলেনকেবল ঘোষণা বা বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে তিনি তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি

নবি করিম (দঃ) বিদায় হজের ভাষণে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না-করার উপদেশ দেনআল্লাহ পাক কোরআনের সূরা কাফেরুনে বলেছেন: লাকুম দ্বীনুকুম অলিয়াদ্বীনঅর্থাৎ যার যার ধর্ম তার তার কাছে

নবি করিম (দঃ)-এর মদিনা সনদ, বিদায় ভাষণ এবং আল্লাহর পাক কালাম থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়বঙ্গবন্ধুও একইভাবে বিভিন্ন সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন
আগেই বলেছি, ব্যক্তিজীবনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন খাঁটি ঈমানদার মুসলমানতিনি বাংলাদেশে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেনইসলামের বিধানের পরিপন্থি মদ, জুয়া তিনি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেনমদ, গাঁজা, আফিম ইত্যাদির উপর বঙ্গবন্ধু আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পরবর্তীকালে বিএনপি সরকারের আমলে তুলে নেয়া হয়এগুলো এখন অবাধে বিক্রি হচ্ছে, পান করা হচ্ছেবঙ্গবন্ধু হত্যার পর যাত্রা অনুষ্ঠানে প্রিন্সেসদের নাচানোর নাম করে অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছেতাদেরই উত্তরসূরিরা ম্যাডোনা আমদানি করে রাজধানীর হোটেলে অশ্লীলতার যে তান্ডব করে তা আজও কেউ ভোলেনি সেই সাথে প্রসার সাধন করা হচ্ছে ভিসিআর অপসংস্কৃতিরইসলামিক ফাউন্ডেশন বঙ্গবন্ধুর আর একটি অমর কীর্তিমাদ্রাসা শিক্ষা প্রসারের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডও তিনি গঠন করেছিলেনপবিত্র হজের পর মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমাবেশ তাবলিগ জামাতের জন্য তিনি ঢাকার অদূরে টঙ্গীতে জমি প্রদান করেনবঙ্গবন্ধু প্রদত্ত এ জমিতেই দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানেদের উপস্থিতিতে প্রতি বছর সগৌরবে তাবলিগ জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছেস্বাধীনতার পর পর স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রেডিও-টেলিভিশনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পবিত্র কোরআন ও তাফসির প্রচার শুরু হয়
তিনিই প্রথম বাংলাদেশকে ইসলামী উম্মার সাথে অঙ্গীভূত করার মানসে ইসলামি সম্মেলন সংস্থা ঙওঈ সম্মেলনে যোগদান করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে এই সংস্থাভুক্ত করেন বঙ্গবন্ধুর সময়ে হজব্রত পালনের জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করা হয় পরবর্তী সরকারগুলো এ অনুদান বন্ধ করে দিয়েছে
বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পর আজ দেশে অনৈসলামিক ও শরিয়ত বিরোধী আচরণের ক্ষেত্রে সরকারি ও পৃষ্ঠপোষকতা চলছেঅবক্ষয় হচ্ছে মূল্যবোধেরএ অভিযোগ স্বয়ং আলেম সমাজেরওবিএনপি সরকার তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে নাটক করলোকিন্তু যখন একজন কবি মহানবী (দঃ) সম্পর্কে কটুক্তি করেছিল, বঙ্গবন্ধু তখন তাকে কারারুদ্ধ করেছিলেনবঙ্গবন্ধু ও বিএনপির ইসলাম প্রীতির মধ্যে এই হলো পার্থক্য বঙ্গবন্ধু কোরআন ও সুন্নাহর আদর্শের প্রতি সব সময়ই ছিলেন আন্তরিক আর বিএনপি ইসলামকে নিয়ে রাজনীতি করে আসছে
সৈয়দ আবুল হোসেন : রাজনীতিবিদ; এম পি; মন্ত্রী, লেখক, কলামিস্ট ও রাজনীতিক বিশ্লেষকপ্রবন্ধটি আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের লেখা স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নামক গ্রন্থ হতে গৃহীত, রচনাকাল আগস্ট, ১৯৯৪

মোঃ হাফিজুর রহমান
সুপারিনটেনডেন্ট
চাঁন্দাইর দারুল উলুম দ্বি-মুখী দাখিল মাদ্রাসা
কালাই, জয়পুরহাট।

 

You can leave a response, or trackback from your own site.

Leave a Reply